স্টাফ রিপোর্টার, দিনাজপুর তাজ ফারাজুল ইসলাম চৌধুরী দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার পাঁচপীর বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। আগুনে পাঁচ ব্যবসায়ীর প্রায় ১৭ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় সৌদি প্রবাসী দোকান মালিক মো. আমির আলীর বিরুদ্ধে নিজের দোকানে নিজেই আগুন লাগানোর অভিযোগ তুলে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও নতুন করে সামনে এসেছে। থানায় দায়ের করা লিখিত অভিযোগে বাদী মো. ওয়াকিবুর রহমান রুবেল জানান, উপজেলার খামারপাড়া ইউনিয়নের ডাঙ্গাপাড়া (পাঁচপীর) এলাকার বাসিন্দা ও সৌদি প্রবাসী মো. আমির আলীর মালিকানাধীন পাঁচটি দোকানঘরের একটি তিনি এবং দুটি দোকান মো. রশিদুল ইসলাম ফেরতযোগ্য জামানত দিয়ে মাসিক ভাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা করে আসছিলেন। একই ভবনের পাশের আরও কয়েকটি দোকানে মো. মোস্তাফিজুর রহমান, মো. শরিফুল ইসলাম ও মো. মাসুদ রানা বাদশা ব্যবসা করতেন। অভিযোগ অনুযায়ী, বিদেশে লোক পাঠানোর বিষয়কে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে কয়েকজন পাওনাদারের সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরোধ চলছিল। স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের দাবি, আমির আলী (পিতা-মৃত ময়নুল খা), চান্দু (পিতা-মৃত কালু) এবং সোহাগ (পিতা-চান্দু) সৌদি আরবে লোক পাঠানোর কথা বলে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করেন। অভিযোগ রয়েছে, অন্তত আটজনের কাছ থেকে জনপ্রতি প্রায় ১০ লাখ টাকা করে মোট প্রায় ৮০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, দীর্ঘ সময় পার হলেও অনেকের বিদেশ যাত্রা নিশ্চিত হয়নি। কেউ বিদেশে গিয়েও নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। এতে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো চরম আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়েছে। অনেকেই জমিজমা বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে কিংবা সুদে টাকা ধার করে বিদেশ যাওয়ার আশায় অর্থ প্রদান করেছিলেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দিবাগত রাতে আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে পাঁচপীর বাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, পাওনাদারদের চাপ এবং চলমান বিরোধের জের ধরে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের দোকানে আগুন লাগিয়ে দেন। পরে আগুন দ্রুত পাশের দোকানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের তীব্রতায় দোকানে থাকা পণ্য, আসবাবপত্র, ব্যবসায়িক সরঞ্জাম ও নগদ মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বহু বছরের পরিশ্রমে গড়ে তোলা ব্যবসা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। খবর পেয়ে খানসামা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে ততক্ষণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যায়। লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডে মো. ওয়াকিবুর রহমান রুবেলের প্রায় ৯ লাখ টাকার, মো. রশিদুল ইসলামের ৩ লাখ টাকার, মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ২ লাখ টাকার, মো. শরিফুল ইসলামের ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার এবং মো. মাসুদ রানা বাদশার ৫০ হাজার টাকার মালামাল পুড়ে গেছে। সব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৭ লাখ টাকা বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। এদিকে মৃত রবিউল ইসলামের স্ত্রী অভিযোগ করে বলেন, তার জামাতা বাদলকে সৌদি আরবে নেওয়ার কথা বলে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তার কোনো খোঁজখবর পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবারের সদস্যরা বহু চেষ্টা করেও তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি। এ ঘটনায় তারা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন পাত্রারাজ মর্মু, জুয়েল মর্মু, রাফায়েল বেসরা, ইসমাইল মর্মু, মৃত রেজাউল ইসলামের পরিবার, জসিম, ইয়াছিন, জিয়াউর রহমান ও আব্দুল গফুরসহ আরও কয়েকজন। তাদের দাবি, বিদেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতিতে বিভিন্ন সময়ে তাদের কাছ থেকেও লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় তারা এখন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অগ্নিকাণ্ডের পরও অভিযুক্ত ব্যক্তি বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন। দোকান ভাড়ার সময় জমা দেওয়া ফেরতযোগ্য জামানতের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে না বলেও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে তারা দাবি করেছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো একদিকে যেমন বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে, অন্যদিকে নিরাপত্তাহীনতায়ও ভুগছে। অভিযোগের বিষয়ে সৌদি প্রবাসী মো. আমির আলী দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। খানসামা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন কর্মকর্তা মো. আবু সায়েম বলেন, “খবর পাওয়া মাত্র আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনি। তদন্ত সাপেক্ষে আগুনের সূত্রপাতের কারণ জানা যাবে।” খানসামা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল বাসেত সরকার বলেন, “লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” এদিকে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিদেশে পাঠানোর নামে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এবং অগ্নিকাণ্ড—দুই বিষয়ই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন