কোরআনের মুকুট ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ !

ইসলাম ডেস্ক : সমস্ত প্রশংসাই আল্লাহ সুবহানাওয়াতায়ালার। দরুদ ও সালাম আল্লহর প্রেরিত রসূল (সাঃ) এর প্রতি। প্রাত্যহিক জীবনে যে কোনো ভালো কাজ শুরু করার আগে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ পড়ে নেওয়া নেওয়া অপরিহার্য এবং এর দ্বারা পূন্য লাভ হয়। সেই সঙ্গে ওই কাজে রহমত, বরকত ও নেয়ামত লাভে সমর্থ হই এবং এ দ্বারা আল্লাহ সব ধরনের নিয়ত ও কাজ পরিপূর্ণ করে দেন।

‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত। এ আয়াতকে কোরআনের মুকুট বলা হয়। এর অর্থ হচ্ছে, পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি, যিনি অতি দয়ালু ও করুণাময়।

তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, হযরত ওসমান বিন আফফান (রাঃ) রাসূল (সাঃ) কে ‘বিসমিল্লাহ’ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ ‘এতো আল্লাহতায়ালার নাম। আল্লাহর বড় নাম এবং এই বিসমিল্লাহ এর মধ্যে এতদূর নৈকট্য রয়েছে যেমন রয়েছে চক্ষুর কালো অংশ ও সাদা অংশের মধ্যে।’

ইবনে মরদুওয়াই এর তাফসিরে রয়েছে যে; রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ ‘আমার উপর এমন একটি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে যার মত আয়াত হযরত সোলাইমান ছাড়া অন্য কোন নবীর উপর অবতীর্ণ হয় নাই। আয়াতটি হল “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম”।’

 হযরত জাবির (রাঃ) বর্নণা করেন যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন পূর্ব দিকে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়, বায়ুমন্ডলী স্তব্ধ হয়ে যায়, তরঙ্গ বিক্ষুব্দ সমুদ্র প্রশান্ত হয়ে উঠে, জন্তু গুলো কান লাগিয়ে মনযোগ সহকারে শুনতে থাকে, আকাশ থেকে অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হয়ে শয়তানকে বিতারন করে এবং বিশ্ব প্রভু স্বীয় সন্মান ও মর্যাদার কছম করে বলেনঃ ‘যে জিনিসের উপর আমার এ নাম নেওয়া যাবে তাতে অবশ্যই বরকত হবে।’

হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, দোযখের ১৯টি দারোগার হাত হতে যে বাঁচতে চায় সে যেন ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ পাঠ করে। এতেও ঘটেছে ১৯টি অক্ষরের সমাবেশ। প্রত্যেকটি অক্ষর প্রত্যেক ফেরেশতার জন্য রক্ষক হিসেবে কাজ করবে।’

মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূল (সাঃ) এর সোয়ারীর উপর তাঁর পিছনে যে সাহাবী (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন তাঁর বর্ণনাটি এইঃ ‘রাসুল (সাঃ) এর উষ্ট্রীটির কিছু পদস্খলন ঘটলে (হোঁচট খেলে) আমি বললাম যে শয়তানের সর্বনাশ হোক।

তখন তিনি বললেন, এরূপ বলোনা, এতে শয়তান গর্বভরে ফুলে উঠে এবং মনে করে যে, যেন সে-ই স্বীয় শক্তির বলে ফেলে দিয়েছে। তবে হাঁ ‘বিসমিল্লাহ’ বলাতে সে মাছির মত লাঞ্ছিত ও হৃতগর্ব হয়ে পরে।’ ইমাম-নাসাঈ (রঃ) স্বীয় কিতাব ‘আমালুল ইয়াওমে ওয়াল লাইলাহ’ এর মধ্যে এবং ইবনে মরদুওয়াই (রঃ) স্বীয় তাফসীরের মধ্যে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং সাহাবীর নাম বলেছেন ওসামা-বিন-ওমায়ের (রাঃ)।

হাদীসে আছে যে ‘বিসমিল্লাহ’ এর দ্বারা কাজ আরম্ভ করা না হয় তা কল্যাণহীন ও বরকত শূন্য থাকে।

মুসনাদ-ই-আহমাদ এবং সুনানের মধ্যে রয়েছে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ), হযরত সাঈদ বীন যায়েদ (রাঃ) এবং হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসুল (সাঃ) বলেছেন – যে ব্যাক্তি ওযুর সময় বিসমিল্লাহ বলে না তার ওযু হয় না।

রাসূল (সাঃ) হযরত ওমার বিন আবুসালামা (রাঃ) কে বলেনঃ ‘বিসমিল্লাহ বলে খাও, ডান হাতে খাও এবং তোমার সামনের দিক থেকে খেতে থাক।’

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম এর অর্থঃ- ‘পরম করুনাময় ও অসীম মেহেরবান আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি।’

ইবনুল মোবারাক বলেন, ‘রহমান’ তাঁকেই বলে যাঁর কাছে চাইলে তিনি দান করেন, আর ‘রাহিম’ তাঁকে বলে যাঁর কাছে না চাইলে তিনি রাগ্বান্বিত হন। জামে’উত তিরমিযীতে আছে যে, আল্লাহতায়ালার নিকট যে ব্যাক্তি চায় না তিনি তার প্রতি রাগ্বান্বিত হন।

আমালুল কুরআন :
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম এর আমলকারীর মর্যাদা আল্লাহ তাআলা বৃদ্ধি করবেন। যা কুরআন-হাদিসে এসেছে এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের জিন্দেগিতেও এর বাস্তবতা পাওয়া গেছে। বিসমিল্লাহর আমলের রয়েছে অনেক ফজিলত।

১. যে ব্যক্তি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম ৬শ’ বার লিপিবদ্ধ করে সঙ্গে রাখবে, আল্লাহ পাক তাঁর বান্দাদের ওপর সে ব্যক্তির প্রভাব সুপ্রতিষ্ঠিত করে দেবেন, কেউ তার ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম হবে না।

২. হজরত আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, `আদম সন্তান যখন কাপড় খোলে, তখন তার সতর ও নিজদের চোখের মধ্যবর্তী পর্দা হচ্ছে `বিসমিল্লাহির-রাহমানির রাহিম`। তাহলে আল্লাহ ইচ্ছা করলে বিসমিল্লাহর আমলকারীদের জন্য জাহান্নামকেও আড়াল করে দিতে পারেন।

৩. যে ব্যক্তি কোনো নেক মকসুদ হাসিলের জন্য বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম ১২ হাজার বার এভাবে পাঠ করে যে, প্রত্যেক ১ হাজার বার পাঠ করার পর দু’রাকাআত নামাজ আদায় করে দোয়া করবে। এভাবে ১২ হাজার বার পাঠ করে দোয়া করলে, আল্লাহ তাআলার রহমতে ঐ ব্যক্তির মকসুদ পূর্ণ হয়।

৪. হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে লক্ষ্য করে এরশাদ করেন, ‘হে আবু হুরায়রা! তুমি যখন অজু করবে, বিসমিল্লাহ বলবে। তাহলে ফেরেশতাগণ তোমার অজু শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমার জন্য পুণ্য লিখতে থাকবে। তুমি যখন স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করবে, তখন বিসমিল্লাহ বলবে। তাহলে যতক্ষণ না তুমি গোসল শেষ করবে, ততক্ষণ ফেরেশতাগণ তোমার জন্য পুণ্য লিখতে থাকবে। সেই সহবাসে যদি তোমার কোনো সন্তান লাভ হয়, তবে সেই সন্তানের নিঃশ্বাস এবং তার যদি বংশধারা চালু থাকে, তবে যতকাল তা চালু থাকবে, ততকাল পর্যন্ত তাদের সবার নিঃশ্বাসের সংখ্যা পরিমাণ পুণ্য তোমার আমলনামায় লেখা হতে থাকবে। হে আবু হুরায়রা! তুমি যখন পশুর পিঠে চড়বে, তখন বিসমিল্লাহ বলবে। তাহলে তার প্রতি কদমে তোমার জন্য পুণ্য লেখা হবে। আর যখন নৌকায় চড়বে, তখনো বিসমিল্লাহ বলবে। তাহলে যতক্ষণ না তুমি তা থেকে নামবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার জন্য পুণ্য লেখা হতে থাকবে।`

৫. যে ব্যক্তি ১০০ বার বিসমিল্লাহির রাহমানির লিখে ক্ষেতে-খামারের দাফন করে রাখে, আল্লাহ তাআলা সব ধরনের বালা-মুসিবত থেকে ফসলের হেফাজত করেন। ফসলের বরকত বৃদ্ধি করে দেন। এছাড়াও জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তির গলায় অথবা বাহুতে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম লিখে দিলে আল্লাহর রহমতে জ্বর চলে যায়।

৬. রোম সম্রাট একবার খলিফাতুল মুসলিমিন হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর দরবারে তার মাথা ব্যথার কথা জানিয়ে প্রতিকারের জন্য আবেদন করেছিল। হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে একটি টুপি প্রেরণ করেছিলেন। যতক্ষণ এ টুপি মাথায় থাকতো ততক্ষণ মাথা ব্যথা হতো না। কিন্তু যখনই মাথা থেকে টুপি সরানো হতো, সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা শুরু হতো। এ ঘটনায় সবাই বিস্মিত হয়। অবশেষে টুপি খুলে এর কারণ অনুসন্ধান করে দেখা গেল যে তাতে শুধু ‘বিসমিল্লাহ’ লিপিবদ্ধ রয়েছে।

৭. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি `বিসমিল্লাহ` লেখা আছে এমন কোনো কাগজের টুকরা আল্লাহ তায়ালার তাজিমের উদ্দেশ্যে হেফাজত করেন, আল্লাহর কাছে তার নাম সিদ্দিকদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হয় এবং তার পিতামাতার শাস্তি লাঘব করা হয়, যদিও তারা মুশরিক হয়ে থাকে।’

তাফসিরে মারেফুল কোরআনে বিসমিল্লাহ বিষয়ে স্থানে স্থানে নানা উপদেশ রয়েছে। হজরত রাসুলে মকবুল (সা.) বলেছেন, ঘরের দরজা বন্ধ করতে, বাতি নেভাতে, কোনো কিছু খাওয়া, পানি পান করা, ওজু করা, যানবাহনে চড়া, যানবাহন থেকে নামতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলার নির্দেশনা পবিত্র কোরআন-হাদিসে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত ছাড়া এ পবিত্র নামটি কারও জন্য প্রযোজ্য নয়। আল্লাহপাক এমন সত্তার নাম, যে সত্তা (আল্লাহপাক) সব গুণের এক অসাধারণ প্রকাশবাচক। তিনি অদ্বিতীয়। নজিরবিহীন, তুলনাহীন বৈধ ভালো সর্বক্ষেত্রে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলে শুরু করেন। তাই আল্লাহপাক হজরত জিব্রাইলের (আ.) মাধ্যমে যে পবিত্র কোরআনের আয়াতে নির্দেশ দিয়েছেন ‘ইকরা বিসমি রাব্বিকা’- পাঠ করুন আপন পালনকর্তার নামে।

কাজেই প্রত্যেক মানুষের চলমান জীবনের প্রত্যেক কাজের ‘শুভ সূচনায়’ বিসমিল্লাহ বলা অপরিহার্য। রাসুলের এ সুন্নত পালনের মাধ্যমে রাসুলের প্রতি আমাদের ভালবাসা প্রদর্শণ করা উচিত।

Check Also

বিদেশে নয় দেশের মাটিতেই বিয়ের পরিকল্পনা রকুল-জ্যাকির

সংবাদবিডি ডেস্ক ঃ রকুল প্রীত সিং ও জ্যাকি ভাগনানির বিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি। বিয়ের প্রস্তুতি এখন …