নতুন সিদ্বান্তে যাচ্ছে হিজড়ারা

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:

ছেলে সন্তান মিলনের বয়স যখন ১১ বছর তখন তার মধ্যে মেয়েদের আচরণ দেখা যায়। পরিবার সেটা লুকানোর চেষ্টা করে। আর মিলন লজ্জা ঢাকতে চলে যান হিজড়ার আস্তানায়। সেখানেও আরেক অমানবিকতা। বাচ্চা নাচানোর নামে জোর করে অর্থ আদায়, আর হাটে-বাজারে তোলা তুলে বেঁচে থাকা।

এসব থেকে বেরিয়ে নিজেদের পাঁয়ে দাড়াতে চান মিলনের মতো তৃতীয় লিংগের মানুষেরা। তাই তারা এসেছেন কারিগরি প্রশিক্ষণ নিতে। কেউ নিচ্ছেন কম্পিউটার আবার কেউ নিচ্ছেন সেলাই প্রশিক্ষণ। তারা কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন, বলেন আমাদের জীবনটা আসলে কোন জীবন।

ঝিনাইদহ সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় পদ্মা সমাজ কল্যান সংস্থার বাস্তাবায়নে অংশ নেওয়া এ জাতীয় ৫০ জন হিজড়ার দাবি তারাও অন্যদের মতো বাঁচতে চান। পড়ালেখা শিখে সরকারি-বেসরকারি চাকুরিতে অংশ নিতে চান। কিন্তু রাষ্ট্র তাদের সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত রেখেছেন। তারা রাষ্ট্রের কাছে অন্যরা যে সুবিধা পাচ্ছেন তারাও সেই সুবিধা দাবি করেন। তারা প্রশিক্ষণ শেষে নিজের পাঁয়ে দাড়াবার মতো সরকারি সহযোগিতা চান।

পদ্মা সমাজ কল্যান সংস্থার নির্বার্হী পরিচালক মোঃ হাবিবুর রহমান জানান, সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ঝিনাইদহ জেলায় পরিচালিত এক জরিপে পাওয়া গেছে ৯৫ জন হিজড়া এখানে বসবাস করছেন। তারা জরিপ করে পেয়েছেন ৯৭ জন। তবে প্রকৃত হিজড়ার সংখ্যা দুই শতাধিক। যাদের বেশির ভাড়ই নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে এক প্রকার লোকচক্ষুর আড়ালে জীবন কাটাচ্ছেন।

হাবিবুর রহমান আরো জানান, এই তৃতীয় লিংগের মানুষগুলোকে সমাজের মূল শ্রোত ধারায় ফিরিয়ে আসনে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। তার মধ্যে একটি বড় কর্মসুচি হিজড়াদের কারিগরি প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা। আর এই কাজটি বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন তাদের সংস্থা। তিনি জানান, বর্তমানে সমাজসেবার সহযোগিতায় তারা ৫০ জন হিজড়ার এই প্রশিক্ষন দিচ্ছেন। যাদের মধ্যে পদ্মার আয়োজনে ১২ জন কম্পিউটার ও ২৫ জন সেলাই এবং শহর সমাজসেভায় ১৩ জন সেলাই প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। সপ্তাহের ৬ দিন এদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এভাবে ৫০ দিনের প্রশিক্ষণ চলবে। প্রশিক্ষণ এর মাঝে প্রশিক্ষনে অংশ নেওয়াদের নাস্তা ও দুপুরের খাবার দেওয়া হয়। এছাড়াও তাদের জন্য কিছু সম্মানিও রয়েছে।

সরেজমিনে শনিবার প্রশিক্ষণ স্থানে গিয়ে কথা হয় একাধিক হিজড়ার সঙ্গে। তারা জানান, প্রতিবছরই হিজড়ার সংখ্যা বাড়ছে। যারা পরিবারের সঙ্গে থাকতে চান। কিন্তু কিছু বয়ষ্ক হিজড়া আছেন যারা তাদের নিয়ে গিয়ে শরীরে অস্ত্রপচারের মাধ্যমে তাদের লাইনে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু অধিকাংশ হিজড়া সেই অমানবিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে চান না। তারা চান নিজেদের পাঁয়ে দাড়াতে, কাজ করে সম্মানের সঙ্গে জীবন কাটাতে। মেহেদী হাসান নামের এক হিজড়া জানান, নবম শ্রেণীতে পড়ালেখা করতেন তিনি।

শরীরের এই পরিবর্তনে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় অন্য এক হিজড়ার আস্তানায়। সেখানের হিজড়াদের কর্মকান্ড তার পছন্দ না হওয়ায় বাড়ি ফিরে এসেছেন। কিন্তু এখন আর স্কুলে যেতে পারছেন না। হিজড়া বলে তাকে ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না। পলাশ নামের আরেক হিজড়া জানান, আগামী বছর তিনি এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিবেন। কিন্তু বাড়িতে থেকে পড়ালেখা করতে হচ্ছে। স্কুলের শিক্ষকরা জানিয়ে দিয়েছেন তোমার এই শরীর নিয়ে স্কুলে আসার প্রয়োজন নেই।

এইচ.এস.সি পাশ করেছেন হিজড়া সজিব। তিনি জানান, অনেক কষ্ট করে সকলের বঞ্চনা উপেক্ষা করে পড়ালেখা শিখেছেন। কিন্তু চাকুরিতে যাবার কোনো সুযোগ তার নেই। চাকরির জন্য আবেদন করলেই হিজড়া দেখে বাদ দেওয়া হয়। তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলেন, এটা কোনো জীবন হতে পারে না। তারা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে চান। সুমন নামের একজন জানান, পদ্মা তাদের একত্রিত করেছে। মাঝে মধ্যে নানা পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের অধিকার নিয়ে বুঝতে শেখাচ্ছেন। তাদের কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। চেষ্টা করে যাচ্ছেন হিজড়ারা যেন সমাজের বোঝা হয়ে না থেকে নিজেরা কিছু করতে পারেন। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।

এ বিষয়ে পদ্মার নির্বাহী পরিচালক মোঃ হাবিবুর রহমান জানান, এদেরকে মাত্র ৫০ দিনের নয় আরো বেশি বেশি কারিগরি প্রশিক্ষন দিতে হবে। তাদেরকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি তারা প্রশিক্ষণ শেষে নিজের পাঁয়ে দাড়াতে পারে সে জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে আয়বর্ধক কাজে এদেরকে নিয়ে সম্মিলিত উদ্যোগ সৃষ্টি করতে হবে। তাহলেই তৃতীয় লিংগের মানুষগুলোকে মূল শ্রোতধারায় ফিরিয়ে আনা যাবে।

এ ব্যাপারে জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুল মতিন জানান, হিজড়াদের আত্বকর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ১০ হাজার টাকার পন্য দেওয়া হবে। যা দিয়ে তারা কাজ করতে পারবে। অন্যদের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে।

Check Also

ফরিদপুরে স্ত্রীর হাতে স্বামী খুন

সংবাদবিডি ডেস্ক ঃ ফরিদপুরে স্ত্রীর লোহার রডের আঘাতে খুন হয়েছে স্বামী। শনিবার রাত সাড়ে ১১টার …