দেশজুড়ে পরিবহন ধর্মঘটের নামে নৈরাজ্য

ডেস্ক রিপোর্ট :    “মানুষ হত্যার স্বাধীনতা চাই’। দুর্ঘটনায় কারও মৃত্যু হলে ‘চালকের’ বিচার করা যাবে না। এমন দাবির বৈধতা দিতে হবে। দিতেই হবে! নইলে সড়কে গাড়ির চাকা ঘুরবে না। ধর্মঘট চলবে লাগাতার। অচল করে দেয়া হবে গোটা দেশের সড়ক যোগাযোগ”। তাই হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের ঘটনায় দুই চালককে দ- দিয়েছেন আদালত। এই রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সারাদেশে লাগাতার ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে একটি শ্রমিক সংগঠন। কর্মসূচীর প্রতি প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সমর্থন যুগিয়েছেন মালিক সমিতির নেতারাও। অথচ ধর্মঘট আহ্বানকারী সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি হলেন শাজাহান খান। যিনি সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য। সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি হলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙা। সরকারের প্রভাবশালী দুই মন্ত্রী যখন দুই পরিবহন সংগঠনের শীর্ষ নেতা তখন দেশবাসীকে জিম্মি করে লাগাতার পরিবহন ধর্মঘট কার স্বার্থে? এমন প্রশ্ন তোলেছেন যাত্রী অধিকারের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠন। পূর্বঘোষণা ছাড়াই মঙ্গলবার সকাল থেকে সারাদেশে লাগাতার পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। এতে দেশের সড়ক যোগাযোগ অচল হয়ে যায়। রাজধানী ঢাকার সঙ্গেও সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। চরম দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয় যাত্রীদের। বাস টার্মিনালগুলোতে মানুষের ভিড়। গাড়ি ছাড়ার অপেক্ষা। জরুরী প্রয়োজনে গন্তব্যে যেতে পারছেন না কেউ। পণ্য পরিবহনে দেখা দিয়েছে অচলাবস্থা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে। তাছাড়া খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় রবিবার থেকে পরিবহন ধর্মঘটের কারণে কাঁচামালে পচন ধরছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধে শ্রমিকরা অবস্থান নিয়েছে বলেও জানা গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাস থেকে সকালে যাত্রী নামিয়ে দেয় ধর্মঘটিরা।

সারা দেশে পরিবহন ধর্মঘটের বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব অযৌক্তিক ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেয়া উচিত। ধর্মঘট আহ্বানকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আদালত এ রায় দিয়েছেন, জনগণ দেয়নি। রায়ের সঙ্গে জনগণের কোন সম্পর্ক নেই। তাহলে জনগণ কেন কষ্ট পাবে?’ মঙ্গলবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় ওবায়দুল কাদের এ কথা বলেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত প্রায় এক বছরে খোঁড়া অজুহাতে সারাদেশে অন্তত ২০ বার পরিবহন ধর্মঘট ডেকেছে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো। তাদের দাবিসমূহের মধ্যে রয়েছে, চালকদের সাজা মওকুফ, বাড়তি পণ্য পরিবহনের সুবিধা নিশ্চিত করা, মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ, ওয়েস্কেলে চাঁদা নেয়া বন্ধ প্রভৃতি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলমান ধর্মঘটের মূল কারণ হলো সড়ক পরিবহন আইনে চালকের সাজা কমানো। এরই মহড়া হিসেবে কঠোর কর্মসূচী দেয়া হয়েছে। অথচ সড়ক দুর্ঘটনা থামছে না। ১৮ দিনে নিহত হয়েছে ১৮৫ জনের বেশি।

২০১১ সালে ঢাকা-আরিচা সড়কে মানিকগঞ্জের জোকা নামক স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় নন্দিত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও বিশিষ্ট সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহতের ঘটনায় করা মামলায় মানিকগঞ্জের একটি আদালত সম্প্রতি এক বাসচালকের যাবজ্জীবন কারাদ-াদেশ দেন। রায়ের প্রতিবাদে রবিবার থেকে শুরু খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট বন্ধের ঘোষণা দেয়া হয় সোমবার সন্ধ্যায়। এছাড়া ২০০৩ সালে সাভারে ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রাক চাপা দিয়ে এক গৃহবধূকে হত্যার দায়ে সোমবার ঢাকার একটি আদালত ওই চালকের বিরুদ্ধে মৃত্যুদ-ের রায় ঘোষণা করেন। এ দুটি রায়ের বিরুদ্ধে এবং আটক দুই চালকের মুক্তির দাবিতে সোমবার রাতে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের এক জরুরী সভায় সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হয়, যা শুরু হয় মঙ্গলবার ভোর ৬টা থেকে।

ধর্মঘটের কারণে রাজধানীজুড়েও মানুষের দুর্ভোগ চরমে ওঠে। রেল ও নদীপথে যারা ঢাকায় আসেন তাদের বাসায় ফিরতে চরম বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে। সকালে গাবতলী ও মহাখালী এলাকা থেকে কিছু সিটি সার্ভিস চলাচলের চেষ্টা করলে শ্রমিকরা বাস চালক ও কন্ডাক্টরদের মারধর করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। দুপুরের মধ্যে গোটা রাজধানী হয় গণপরিহনশূন্য।

মঙ্গলবার রাতে সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ জনকণ্ঠকে বলেন, কর্মসূচী এখনও অব্যাহত রয়েছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত সংকট সমাধানে সরকারের সঙ্গে আলোচনার কোন ডাক আসেনি। সরকার চাইলে আমরা সমস্যা সমাধানে যে কোন সময় আলোচনায় বসতে রাজি। ধর্মঘট তো আর লাগাতার চলতে দেয়া যায় না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলীর সঙ্গে কয়েকদফা যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। সংগঠনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহিম বক্স দুদু চলমান পরিবহন ধর্মঘট প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘এটা আমাদের সাংগঠনিক কোন সিদ্ধান্ত নয়। চালকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গাড়ি চালানো বন্ধ করেছেন। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।’

আব্দুর রহিম বক্স বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় প্রচলিত আইনে বিচার করা হয়নি। বিশেষভাবে এর বিচার করা হয়েছে। আমরা চাই প্রচলিত আইনেই এ দুর্ঘটনার বিচার করা হোক। তিনি আরও বলেন, ‘চালক জামিরকে সাজা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তার গাড়ি চালনার বয়স ৩৩ বছর। এরপরও তাকে অদক্ষ চালক বলা হচ্ছে। তাহলে যাদের ড্রাইভিং লাইসেন্সের বয়স দুই তিন বছর তারা গাড়ি চালাতেই জানেন না। আমরা আর গাড়ি চালিয়ে কি করব। তাই আমরা গাড়ি চালানো থেকে অবসরে গেলাম।

ধর্মঘট কিভাবে হলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আদালতের রায়ের বিষয়ে আমরা সেদিন রাতেই আলোচনা করেছিলাম। তখন রাতে টিভিতে খবর দেখলাম সাভারে সড়ক দুর্ঘটনায় মির হোসেন মিরু নামের এক চালকের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। মূলত এ রায়ের খবর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে গাড়ি চালানো বন্ধ করে দেয়।’

সম্প্রতি সড়ক পরিবহন আইনকে যুগোপযোগী করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় চালক দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের দাবি ওঠে। কেউ কেউ আবার যাবজ্জীবন কারাদ-ের বিধান রাখারও দাবি জানান। কিন্তু পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের পক্ষ থেকে বরাবরই নতুন আইনে এরকম বিধান না রাখার দাবি চানানো হয়েছে। সর্বশেষ আইনে পাঁচ থেকে তিন বছর পর্যন্ত চালকের শাস্তি বহাল আছে। যদিও কয়েক বছরেও আইনের চূড়ান্ত খসড়া সম্ভব হয়নি।

রাজধানীর পথে পথে দুর্ভোগ ॥ অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে খোদ রাজধানীতেও। দিনভর পথে পথে মানুষের দুর্ভোগ লক্ষ্য করা গেছে। পায়ে হেঁটে চলতে হয়েছে বেশিরভাগ পথচারীকে। সকালে নগরীর বিভিন্ন রুটে গণপরিবহন চলাচল করতে দেখা গেলেও দুপুর থেকে তা কমতে শুরু করে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে যাত্রীদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। যাত্রীরা জানান, বাস, অটোরিক্সা কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে দু’একটি বাস এলেও যাত্রী তোলা হচ্ছে না। তাই সাধারণ মানুষকে পায়ে হেঁটে চলতে দেখা গেছে। বেশিরভাগ যাত্রীর চলাচলের একমাত্র ভরসা রিক্সা। বাড়তি ভাড়া দিয়ে রিক্সা নিয়ে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে সবাইকে।

এদিকে ধর্মঘটের কারণে রাজধানীর কমলাপুর রেল স্টেশন, সদরঘাট বাস টার্মিনাল, মহাখালী, সায়েদাবাদ ও গাবতলী টার্মিনালে আসা যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয় আরও বেশি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ জানিয়েছেন, সড়ক দুর্ঘটনা মামলায় দুজন চালকের বিরুদ্ধে কঠোর সাজার রায় হওয়ায় শ্রমিকরা গাড়ি চালানো বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি দ্রুত সংকট যেন সমাধান হয়।

গাবতলী এলাকার দায়িত্বরত ট্রাফিক বিভাগের এক উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, প্রথমে ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে ট্রাক শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছিল। কিন্তু সকাল নয়টার পর থেকে আবার তাঁরা অবরোধ শুরু করে ভাঙচুর চালান। ঢাকা মহানগর ট্রাফিক বিভাগের (পশ্চিম) উপকমিশনার লিটন কুমার সাহা বলেন, পরিবহন শ্রমিকদের অবরোধের কারণে কোন যান চলাচল করতে পারছে না। এতে যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েছেন। দিনাজপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা যাত্রীরা জানিয়েছেন, সকালে গাবতলী এলাকা কিছু বাস চলাচল শুরু করলেও অন্য শ্রমিকরা এসে চালক ও কন্ডাক্টরকে মারধর করে। বাংলাদেশ আন্তঃজেলা ট্রাক চালক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের দাবি বাসচালক জামির হোসেনের যাবজ্জীবন কারাদ- ও সড়ক দুর্ঘটনার দায়ে এক ট্রাকচালকের মৃত্যুদ- প্রত্যাহার করতে হবে। এই দাবি না মানা পর্যন্ত অবরোধ কর্মসূচী চলবে। পাশাপাশি সারা দেশে ধর্মঘটও চলবে। ধর্মঘটের অংশ হিসেবে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে এ্যাম্বুলেন্স ও সংবাদপত্রবাহী যান চলাচল করবে।

ধর্মঘট অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি ॥ জনদুর্ভোগ লাঘবে সারা দেশে সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘট অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি। মঙ্গলবার এক যুক্ত বিবৃতিতে জাতীয় কমিটির উপদেষ্টা মনজুরুল আহসান খান ও সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে এই আহ্বান জানান। এ ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পরিবহন মালিক ও সরকারের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছে একটি পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবিতে দীর্ঘদিন কাজ চালিয়ে আসা বেসরকারী এই সংগঠনটি।

বিবৃতিতে বলা হয়, আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে এভাবে ধর্মঘট ডাকা স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ এবং আদালত অবমাননার শামিল। রায়ে সংক্ষুব্ধ উচ্চ আদালতে আপীল না করে দাবি আদায়ের যে পথ বেছে নিয়েছেন তা শুধু অগ্রহণযোগ্য ও অনভিপ্রেতই নয়, আইনের শাসন ও ন্যায় বিচারের পরিপন্থীও। সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের এই ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ সড়ক দুর্ঘটনায় শত শত মানুষের অকাল প্রাণহানির জন্য দায়ী প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষার অপচেষ্টা ও অপকৌশল, যা একটি নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রধান অন্তরায়।

বিবৃতিদাতারা বলেন, সড়ক পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের প্রধান দু’টি সংগঠনের দুই শীর্ষ নেতাই সরকারের মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্য। তা সত্ত্বেও আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে ধর্মঘট আহ্বান করায় দেশজুড়ে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থাসহ সড়ক পরিবহন খাতের এই বিশৃঙ্খল ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির দায়ভার অনেকাংশে সরকারের ওপরই বর্তায়। বিবৃতিতে জাতীয় কমিটির নেতারা অনৈতিক দাবি আদায়ের নামে সাধারণ মানুষকে কষ্ট না দিয়ে বিচারিক আদালতের দেয়া সাজার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার জন্য পরিবহন শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানান।

সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে ধর্মঘট ॥ দেশের আপামর জনগণের প্রত্যাশিত আদালতের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে ডাকা দেশব্যাপী পরিবহন ধর্মঘট অনতিবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ দাবি জানায় সংগঠনটি। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশবরেণ্য খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও বিশিষ্ট সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ ৫ জনকে সড়ক দুর্ঘটনায় হত্যার দায়ে ঘাতক বাসচালক জামির হোসেনের বিরুদ্ধে মানিকগঞ্জের আদালতের দেয়া রায়ের প্রতিবাদে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে চুয়াডাঙ্গায়, গত রবিবার থেকে খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় পরিবহন ধর্মঘট চালানো হয়। সাভারে ট্রাকচাপা দিয়ে এক নারীকে হত্যার দায়ে সোমবার ঢাকার এক আদালত চালক মীর হোসেনের ফাঁসির রায় দেয়ার প্রতিবাদে সকাল থেকে সারাদেশে আকস্মিক পরিবহন ধর্মঘটে দেশের কোটি কোটি যাত্রীকে জিম্মি করা হয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ডাকা এই ধর্মঘট আদালত অবমাননাকর, অযৌক্তিক ও গণবিরোধী বলে দাবি করেন সংগঠনটি।

নিম্ন আদালতের রায়ে সংক্ষুব্ধ হলে উচ্চ আদালতে যাওয়ার পরিবর্তে ডাকা এ পরিবহন ধর্মঘট পেশী শক্তি প্রদর্শন করে জনগণকে জিম্মি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার একটি সুগভীর নীলনকশা উল্লেখ করে বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সরকার যখন জনস্বার্থে তথা যাত্রীর স্বার্থে বা সড়ক নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু ভাল সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায় তখনই কিছু স্বার্থান্বেষী মালিক-শ্রমিক নেতারা এতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা ধর্মঘটের নামে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে সরকারের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। প্রকৃতপক্ষে তারা কি গাড়িচাপা দিয়ে মানুষ হত্যাকে বৈধতা দিতে চায়? এই সব স্বার্থান্বেষীদের ষড়যন্ত্রে সড়ক নিরাপত্তা আজ চরমভাবে ভূলণ্ঠিত হচ্ছে। সড়কে মাছির মতো পাখির মতো মানুষ মরছে। প্রত্যাশিত একের পর এক রায়সমূহ সরকারের একটি সদিচ্ছার প্রতিফলন হলেও এ রায় তথা আদালতকে চ্যালেঞ্জ করে ডাকা পরিবহন ধর্মঘট বন্ধে সরকারের তেমন কোন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

অনতিবিলম্বে এ অযৌক্তিক ও গণবিরোধী ধর্মঘট প্রত্যাহার করে সড়ক নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারী সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়নের সহায়ক ভূমিকা রাখার জন্য মালিক-শ্রমিক নেতৃবৃন্ধের প্রতি জোর দাবি জানায় সংগঠনটি।

ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা ॥ দাবি না মানা পর্যন্ত ধর্মঘট চালিয়ে যাবার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনরত পরিবহন শ্রমিকরা। বিষয়টি নিয়ে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানান শ্রমিকরা। মঙ্গলবার বিকেলে গাবতলীতে এক সমাবেশে বাংলাদেশ আন্তঃজেলা ট্রাক চালক ইউনিয়নের সভাপতি তাজুল ইসলাম নিজেদের এ অবস্থানের কথা জানান।

রাজধানীর বাইরে ॥ আকস্মিক এ ধর্মঘটের কারণে জয়পুরহাটের সব সড়কে বাস ও ট্রাকসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছে হাজার হাজার যাত্রী। বাস ও ট্রাক ধর্মঘটের কারণে কাঁচামাল ব্যবসায়ীরাও পরেছে সঙ্কটে।

কুড়িগ্রাম ॥ পরিবহন ধর্মঘটে বিরূপ প্রভাব পড়েছে যাত্রী সাধারণের ওপর। পরিবহন বন্ধ থাকায় পচনশীল দ্রব্য নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। হঠাৎ করে গভীর রাতে ধর্মঘট আহ্বান করায় বিভ্রন্তিতে পড়েছে যাত্রী সাধারণ ও পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

নাটোর ॥ পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই মঙ্গলবার সকাল থেকে হঠাৎ করে এই ধর্মঘট শুরু করায় যাত্রী সাধারণ পড়েছে বিপাকে। পথে বের হয়ে আর গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না তারা।

শেরপুর ॥ বাসচালক জামির হোসেনের যাবজ্জীবন সাজার প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট মঙ্গলবার ভোর থেকে শুরু হওয়া ওই ধর্মঘটে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে জেলা শহর।

মাগুরা ॥ জেলায় তৃতীয়দিনের মতো পরিবহন ধর্মঘট অব্যাহত রয়েছে। ফলে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ঢাকা খুলনা, ঝিনাইদহ, যশোর, ফরিদসহ বিভিন্ন রুটে বাসসহ বিভিন্ন যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ঢাকা রোড, ভায়নার মোড়সহ বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে যাত্রীরা ফিরে যাচ্ছেন।

বরিশাল ॥ মঙ্গলবার সকাল থেকে নগরীর কেন্দ্রীয় নথুল্লাবাদ ও রূপাতলী বাস টার্মিনাল থেকে অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার সব রুটের বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে।

রাজশাহী ॥ পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন মানুষ। সাজাপ্রাপ্ত বাসচালক জামির হোসেনের মুক্তির দাবিতে মঙ্গলবার সকাল থেকে রাজশাহীতেও শুরু হয় ধর্মঘট। ফলে রাজশাহী ছেড়ে যায়নি কোন গন্তব্যের যানবাহন।

চুয়াডাঙ্গা ॥ লাগাতার ৭ম দিনের মতো পরিবহন ধর্মঘট অব্যাহত থাকায় মঙ্গলবারও দূরপাল্লা ও আভ্যন্তরীণ রুটে বাস-ট্রাকসহ সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে শ্রমিকরা। সকাল থেকেই শহরের বিভিন্ন সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখায়।

বগুড়া ॥ পরিবহন ধর্মঘটে বগুড়ায় সাধারণ মানুষের ব্যাপক দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে শ্রমিকরা অবস্থান নিয়ে যানবাহন চলাচলে বাধা দিয়ে ধর্মঘট শুরু করে।

মুন্সীগঞ্জ ॥ কোন ঘোষণা ছাড়াই মঙ্গলবার ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে সব ধরনের যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ ছিল। এতে সকাল থেকেই শিমুলিয়া ঘাটে বাস না পেয়ে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে দেখা গেছে।

চট্টগ্রাম ॥ সোমবার মধ্যরাতের পর থেকে চট্টগ্রামে আকস্মিকভাবে যানবাহন ধর্মঘট শুরু হলে যাত্রী সাধারণের চরম ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। যানবাহন শ্রমিক নেতা মৃণাল চৌধুরী জানিয়েছেন, ফাঁসির দড়ি মাথায় নিয়ে তারা গাড়ি চালাতে পারবেন না।

যশোর ॥ পরিবহন ধর্মঘট তৃতীয় দিনের মতো অব্যাহত থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছে সাধারণ মানুষ। বিকল্প যানবাহন হিসেবে ট্রেন ও বিমানে যাতায়াত করছে সাধারণ মানুষ।

কুমিল্লা ॥ সারাদেশের মতো কুমিল্লা জেলার সহস্রাধিক বাস শ্রমিক ট্রার্মিনাল অবরোধ করে পরিবহন ধর্মঘট শুরু করে।-সূত্রঃ জনকণ্ঠ

Check Also

বিদেশে নয় দেশের মাটিতেই বিয়ের পরিকল্পনা রকুল-জ্যাকির

সংবাদবিডি ডেস্ক ঃ রকুল প্রীত সিং ও জ্যাকি ভাগনানির বিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি। বিয়ের প্রস্তুতি এখন …